
নিজস্ব প্রতিবেদক সমাজে শিক্ষককে সবচেয়ে সম্মানজনক পেশার মানুষদের একজন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। শিক্ষক শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান দেন না, তিনি শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা, মানবিকতা, দায়িত্ববোধ ও মূল্যবোধের শিক্ষাও দিয়ে থাকেন। এ কারণেই শিক্ষককে বলা হয় “জাতি গঠনের কারিগর”। কিন্তু যখন কোনো শিক্ষকের ব্যক্তিগত জীবনে দায়িত্বহীনতা ও মানবিকতার ঘাটতির অভিযোগ সামনে আসে, তখন তা শুধু একটি পরিবারের বিষয় হয়ে থাকে না; বরং পুরো সমাজের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
রাজধানীর মিরপুরে বাসায় মারা যাওয়া প্রবীণ নারী নূর জাহান বেগমের ঘটনাকে ঘিরে নতুন করে এমন প্রশ্ন উঠেছে। জানা গেছে, তার সন্তানদের মধ্যে একজন সচিব, একজন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক এবং আরেকজন কানাডাপ্রবাসী। মেয়ের স্বামীও একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। অর্থাৎ পরিবারের প্রায় সবাই উচ্চশিক্ষিত, প্রতিষ্ঠিত এবং সমাজে সম্মানিত অবস্থানে রয়েছেন।
কিন্তু এত শিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত সন্তান থাকার পরও যদি একজন মায়ের জীবনের শেষ সময় কাটে নিঃসঙ্গতা, অবহেলা ও অসহায়ত্বের মধ্যে, তাহলে সেই শিক্ষা ও প্রতিষ্ঠার প্রকৃত মূল্য কোথায়—এ প্রশ্ন এখন অনেকের মুখে মুখে।
বিশেষ করে একজন শিক্ষকের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা আরও বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। কারণ একজন শিক্ষক শুধু নিজের পরিবারের সদস্য নন, তিনি শত শত শিক্ষার্থীর আদর্শ। শ্রেণিকক্ষে তিনি দায়িত্ববোধ, নৈতিকতা ও মানবিকতার কথা বলেন। তিনি শিক্ষার্থীদের শেখান বাবা-মাকে সম্মান করতে, বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রতি দায়িত্ব পালন করতে এবং সমাজের প্রতি কর্তব্যশীল হতে। কিন্তু বাস্তব জীবনে যদি সেই মূল্যবোধের প্রতিফলন না ঘটে, তাহলে শিক্ষার্থীদের সামনে কী বার্তা পৌঁছায়?
সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, একজন শিক্ষকের ব্যক্তিগত আচরণও শিক্ষার্থীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। কারণ শিক্ষার্থীরা শুধু বই থেকে নয়, শিক্ষকের জীবনযাপন ও আচরণ থেকেও শিক্ষা গ্রহণ করে। তাই একজন শিক্ষক যদি নিজের পরিবার ও মা-বাবার প্রতি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হন, তাহলে তা তার সামাজিক দায়িত্ব নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করে।
একজন মা সন্তানের জন্য যে ত্যাগ স্বীকার করেন, তার কোনো তুলনা হয় না। সন্তানের মুখে হাসি ফোটাতে তিনি নিজের সুখ বিসর্জন দেন, নিজের প্রয়োজনকে উপেক্ষা করেন। অসুস্থতা, কষ্ট কিংবা অভাব—সবকিছুর মধ্যেও সন্তানকে আগলে রাখেন। সেই মায়ের শেষ জীবনে সন্তানের সান্নিধ্য, যত্ন ও ভালোবাসা পাওয়ার অধিকার সবচেয়ে বেশি।
কিন্তু যখন সমাজে এমন ঘটনা সামনে আসে, যেখানে প্রতিষ্ঠিত ও শিক্ষিত সন্তানদের পরিবারে একজন মা অবহেলার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ ওঠে, তখন তা শুধু একটি পরিবারের ব্যর্থতা নয়; এটি আমাদের সামাজিক ও নৈতিক শিক্ষারও ব্যর্থতা।
অনেকেই মনে করেন, বর্তমান সমাজে সনদ ও পেশাগত সফলতার পেছনে ছুটতে গিয়ে মানবিক মূল্যবোধ ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। মানুষ বড় বড় পদ-পদবি অর্জন করছে, কিন্তু মা-বাবার প্রতি দায়িত্ব, পারিবারিক বন্ধন ও মানবিক সম্পর্কের গুরুত্ব অনেক ক্ষেত্রে উপেক্ষিত হচ্ছে। ফলে শিক্ষা অর্জনের পরও প্রকৃত মানুষ হয়ে ওঠার জায়গায় ঘাটতি থেকে যাচ্ছে।
এ ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন—শুধু উচ্চশিক্ষা ও পেশাগত সাফল্য কি একজন মানুষকে মহান করে? নাকি প্রকৃত মহানতা লুকিয়ে থাকে মা-বাবার প্রতি দায়িত্ব পালন, মানবিকতা ও নৈতিক আচরণের মধ্যে?
সমাজের সচেতন মহল মনে করে, সন্তানদের শুধু ডাক্তার, প্রকৌশলী, শিক্ষক বা সচিব হিসেবে গড়ে তুললেই দায়িত্ব শেষ হয় না। তাদের এমন মানুষ হিসেবেও গড়ে তুলতে হবে, যারা বৃদ্ধ মা-বাবার পাশে দাঁড়াবে, তাদের সম্মান করবে এবং জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করবে।
কারণ একজন শিক্ষক যদি নিজের পরিবারেই মানবিক মূল্যবোধের চর্চা না করেন, তাহলে জাতি গঠনের কারিগর হিসেবে তার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠবে। আর যে শিক্ষা মানুষকে নিজের মা-বাবার প্রতি দায়িত্বশীল হতে শেখাতে পারে না, সেই শিক্ষার পূর্ণতা নিয়েও সমাজের প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।






