কূটনৈতিক প্রতিবেদক

আগামী ২৩ থেকে ২৬ জুন চীন সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এই সফরকে ঘিরে কূটনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। দুই দেশের পক্ষ থেকেই সফরকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সফর বাংলাদেশের জন্য নতুন বিনিয়োগ, উন্নয়ন সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক কৌশলগত সম্পর্কের ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিতে পারে।

বিশেষ করে এই সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ বৃদ্ধি, রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ এবং দীর্ঘদিন আলোচিত তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা প্রকল্পে অগ্রগতি আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর চীনের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে এই সফরের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানানো হয়।

এবারের সফরকে শুধু দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বাংলাদেশের নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতির দিকনির্দেশনার একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

চীন সফরে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যাশা রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে চীনা বিনিয়োগ বৃদ্ধি, রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ, শিল্প কারখানা স্থানান্তর, অবকাঠামো অর্থায়ন, তিস্তা প্রকল্পে অগ্রগতি, সরাসরি বিমান যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তি ও উৎপাদন খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণ।

ঐতিহাসিকভাবে বিএনপি ও চীনের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। ২০২৫ সালে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল চীন সফর করে। সেখানে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) নেতাদের সঙ্গে বৈঠক হয় এবং দুই পক্ষই সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে। সেই সময় সিপিসি নেতৃত্ব বিএনপি চেয়ারপারসন ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে চীন সফরের আমন্ত্রণ জানায়।

আওয়ামী লীগ সরকারের সময় চীন বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ উন্নয়ন অংশীদার ছিল। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও বেইজিং ঢাকার সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের সম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী। তিস্তা প্রকল্প, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, শিল্প স্থানান্তর, বন্দর উন্নয়ন ও অবকাঠামো বিনিয়োগসহ একাধিক বিষয় এই সফরের আলোচনায় থাকতে পারে।

চীন দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থানকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করে, বিশেষ করে ভারত–চীন প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে। এছাড়া চীন তার বৈশ্বিক উন্নয়ন উদ্যোগ (জিডিআই), বৈশ্বিক নিরাপত্তা উদ্যোগ (জিসিআই) এবং অন্যান্য কর্মসূচিতে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ বাড়াতে আগ্রহী।

চীন বর্তমানে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় আমদানি উৎস এবং অন্যতম প্রধান উন্নয়ন অংশীদার। তবে দুই দেশের বাণিজ্যে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। ২০২৪ সালে চীন থেকে বাংলাদেশের আমদানি ছিল প্রায় ২২.৮৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, আর বাংলাদেশ থেকে চীনে রপ্তানি ছিল মাত্র ১.১৭ বিলিয়ন ডলার। ফলে মোট বাণিজ্য প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলারের হলেও তা মূলত চীনের পক্ষেই বেশি ভারসাম্যহীন।

ঢাকা দীর্ঘদিন ধরে চীনের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশাধিকার বাড়ানোর চেষ্টা করছে। শুল্কমুক্ত সুবিধা থাকলেও রপ্তানি বহুমুখীকরণ না হওয়ায় সেই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

এই সফরকে ঘিরে দুই দেশের মধ্যে একাধিক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) ও চুক্তি স্বাক্ষরের প্রস্তুতি চলছে। এর মধ্যে থাকতে পারে তিস্তা প্রকল্প, শিল্প বিনিয়োগ, প্রযুক্তি স্থানান্তর, অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও অবকাঠামো উন্নয়ন। পাশাপাশি বড় আকারের চীনা বিনিয়োগ প্যাকেজ বা নতুন বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের ঘোষণা আসতে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে, যদিও এখনো বিষয়গুলো চূড়ান্ত হয়নি।

সফরের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প। দীর্ঘদিন ধরে উত্তরাঞ্চলের কৃষি ও পরিবেশগত সংকট মোকাবিলায় এই প্রকল্পকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। চীন কয়েক বছর ধরে এই প্রকল্পে আগ্রহ দেখিয়ে আসছে। কয়েক বিলিয়ন ডলারের সম্ভাব্য এই প্রকল্প এবার নতুন গতি পেতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র বলছে, তিস্তা প্রকল্পে কারিগরি সহায়তা, অর্থায়ন এবং বাস্তবায়ন কাঠামো নিয়ে আলোচনা হতে পারে। এমনকি যৌথ ঘোষণা বা নীতিগত অগ্রগতির সম্ভাবনাও রয়েছে।

সরকার বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে নতুন করে উদ্যোগ নিয়েছে। বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, ইলেকট্রনিক্স ও প্রযুক্তি শিল্প, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বৈদ্যুতিক যানবাহন, টেক্সটাইল, কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্প এবং বন্দর ও লজিস্টিকস খাতে নতুন বিনিয়োগ প্রত্যাশা করা হচ্ছে। চীনের অনেক প্রতিষ্ঠান উৎপাদন কারখানা স্থানান্তরের বিষয়েও আগ্রহ দেখাচ্ছে, যা বাংলাদেশকে বৈশ্বিক উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়ক হতে পারে।