অনলাইন ডেস্ক

দেশের তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) খাত ও ডিজিটাল অর্থনীতিকে উৎসাহিত করতে বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেটে একগুচ্ছ বড় সুবিধা আসতে পারে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ফ্রিল্যান্সিং আয়, কনটেন্ট ক্রিয়েশন, স্টার্টআপ, প্রযুক্তি শিল্প ও ডিজিটাল ডিভাইস খাতে কর ও শুল্ক কমানোর একাধিক প্রস্তাব থাকতে পারে বলে অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে।

ফ্রিল্যান্সিং ও কনটেন্ট ক্রিয়েশনে কর অব্যাহতি

প্রস্তাবিত বাজেটে সব ধরনের ফ্রিল্যান্সিং আয়ে কর অব্যাহতির সুযোগ সম্প্রসারণ করা হতে পারে। বর্তমানে আইটি ফ্রিল্যান্সিং খাতে কর অব্যাহতি থাকলেও তা অন্যান্য ফ্রিল্যান্সিং আয়ের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

এছাড়া কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের আয়ের ওপর সম্পূর্ণ করমুক্ত সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব থাকতে পারে। এতে তরুণদের ডিজিটাল উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে ওঠার সুযোগ বাড়বে বলে মনে করছে সরকার।

স্টার্টআপ ও প্রযুক্তি ব্যবসায় শূন্য ট্যাক্সের প্রস্তাব

তরুণ উদ্যোক্তা ও উদ্ভাবনী উদ্যোগকে উৎসাহ দিতে স্টার্টআপ এবং প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসার ক্ষেত্রে টার্নওভার ট্যাক্স শূন্য শতাংশ করার প্রস্তাব আসতে পারে। এতে নতুন ব্যবসা শুরু ও ডিজিটাল রপ্তানি বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রস্তাবের বাস্তব কাঠামো ও প্রয়োগ পদ্ধতি এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়।

কমবে প্রযুক্তিপণ্যের আমদানি কর

বাজেটে কম্পিউটার মনিটর, প্রিন্টার, ফ্ল্যাশ মেমোরি ও অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইস আমদানিতে অগ্রিম আয়কর ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২ শতাংশ করার প্রস্তাব থাকতে পারে।

একইসঙ্গে কম্পিউটার ও ডিজিটাল ডিভাইস উৎপাদনের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ও কর অব্যাহতির মেয়াদ ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।

মোবাইল ও টেলিকম খাতে বড় পরিবর্তন

মোবাইল ফোন উৎপাদন শিল্পকে শক্তিশালী করতে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ডিভাইসের কাঁচামালে অগ্রিম কর ১ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব থাকতে পারে। পাশাপাশি মোবাইল নেটওয়ার্ক সেবায় উৎসে কর ১২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাবও আলোচনায় রয়েছে।

সিম কার্ডের ওপর নির্দিষ্ট ভ্যাট কাঠামো পরিবর্তন করে ৩০০ টাকার ফিক্সড ভ্যাট বাতিল করে ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপের ফলে সিমের দাম কমতে পারে।

মোবাইল উৎপাদন ও বিনিয়োগে উৎসাহ

দেশীয় মোবাইল ফোন উৎপাদনকারীদের জন্য কাঁচামাল আমদানিতে কর ছাড় বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। এছাড়া বিটিআরসির লাইসেন্স ফি ও রেভিনিউ শেয়ারের ওপর ২০ শতাংশ উৎসে কর প্রত্যাহারের বিষয়টিও বিবেচনায় আছে।

শাওমি বাংলাদেশের কান্ট্রি ম্যানেজার জিয়াউদ্দিন চৌধুরী বলেন, দীর্ঘমেয়াদি নীতিমালা বিনিয়োগকারীদের জন্য স্বস্তির বার্তা দেবে এবং স্থানীয় মোবাইল শিল্পকে আরও শক্তিশালী করবে।

আইটি খাতে বিশেষজ্ঞদের মত

বেসিসের সাবেক সভাপতি সৈয়দ আলমাস কবীর বলেন, ফ্রিল্যান্সিং ও কনটেন্ট ক্রিয়েশনে করমুক্ত সুবিধা ডিজিটাল অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করবে। স্টার্টআপ খাতে শূন্য টার্নওভার ট্যাক্স উদ্যোক্তা তৈরিতে সহায়তা করবে।

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, বড় আইসিটি ও টেলিকম কোম্পানিগুলোর জন্য বাজেটে বড় ধরনের নতুন সুবিধা খুব বেশি নেই।

অন্যদিকে বিডি জবসের সিইও এ কে এম ফাহিম মাশরুর জানান, ফ্রিল্যান্সিং আয়ে কর অব্যাহতি নতুন নয়, এটি আগেও ছিল। স্টার্টআপ ট্যাক্স সুবিধার প্রকৃত কাঠামো স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

টেলিকম ও ইন্টারনেট খাতে মিশ্র প্রভাব

টেলিকম খাতে কিছু কর সুবিধা দেওয়া হলেও তা ভোক্তা পর্যায়ে বড় প্রভাব ফেলবে না বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। মোবাইল অপারেটরদের ক্যাশফ্লো বাড়লেও ইন্টারনেট বা সেবার দাম কমার সম্ভাবনা সীমিত।

আইএসপিএবি সভাপতি মোহাম্মদ আমিনুল হাকিম বলেন, ফিক্সড ব্রডব্যান্ড খাত এখনো কম বিস্তৃত হলেও সেখানে বিশেষ প্রণোদনা নেই, যা একটি বড় ঘাটতি।

আমদানি নির্ভর প্রযুক্তিপণ্যে কর ছাড়

এসি, ফ্রিজ, ওয়াশিং মেশিন, সিসিটিভি, এটিএমসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিপণ্যের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ও কর অব্যাহতি সুবিধা বাড়ানো হতে পারে। এতে এসব পণ্যের দাম কমার সম্ভাবনা রয়েছে।

মোটরসাইকেলে টিআইএন বাধ্যতামূলক

১৫০ সিসির বেশি মোটরসাইকেল নিবন্ধনের ক্ষেত্রে টিআইএন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। তবে এতে আলাদা কোনো কর পরিশোধ করতে হবে না।

পোশাক ও অন্যান্য খাতে কর ছাড়

রপ্তানি খাতকে উৎসাহ দিতে রপ্তানি আয়ের নগদ প্রণোদনার ওপর উৎসে কর ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব থাকতে পারে। পাশাপাশি প্যাকেজিং, শিল্প কাঁচামাল, পরিবহন ও রিসাইক্লিং খাতেও কর হার কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

বাজেটের মূল লক্ষ্য

এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান জানিয়েছেন, এবারের বাজেটে সাধারণ মানুষের ওপর নতুন করের চাপ না দিয়ে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, ব্যবসা সহজীকরণ এবং ডিজিটাল রাজস্ব ব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

তার ভাষায়, “জনগণকেই বাজেটের মূল ফোকাসে রাখা হয়েছে। দ্রব্যমূল্যের চাপ কমানো এবং ব্যবসা সহজ করাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য।”