ফেনী জেলা প্রতিনিধি: দেশের ১২ জেলায় চলমান বন্যা পরিস্থিতি কোথাও কোথাও ধীর গতিতে উন্নতি হলেও অনেক অঞ্চলেই অবনতি হয়েছে। নতুন করে প্লাবিত হয়েছে অনেক এলাকা। ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল আর ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে গত কয়েকদিন ধরে দেশের ফেনী, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ি, নোয়াখালী, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়ীয়া, সিলেট, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর ও কক্সবাজারে বন্যায় সাধারণ মানুষ দুর্ভোগে রয়েছে। তবে গত দুই দিন বৃষ্টিপাত না হওয়ায় গতকাল শনিবার থেকে এসব অঞ্চলের কোথাও কোথাও বন্যার পানি কমেছে বলে জানা গেছে। এতে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হতে শুরু করেছে। তবে এখনও কুশিয়ারা, মনু, খোয়াই, গোমতি, ফেনী নদীর বেশ কয়েকটি স্টেশনের পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার খবরও পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে ফেনী অঞ্চলে মুহুরী নদীর পানি নতুন করে বিপৎসীমার ওপরে উঠায় সেখানকার অনেক এলাকায় পানি বাড়ার খবর পাওয়া গেছে। তবে আগামী ২৪ ঘণ্টায় যদি আর ভারী বৃষ্টি না হয় তাহলে এসব নদীর পানিও বিপৎসীমার নিচে নেমে আসবে বলে আশা করা যাচ্ছে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানায়, গতকালও দেশের ৬ নদীর ৯ স্টেশনের পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়, শুক্রবার সাত নদীর ১৪টি স্টেশনের পানি বিপৎসীমার ওপরে ছিল।
এর মধ্যে ফেনী নদীর রামগড় স্টেশনের পানি বিপৎসীমার ২০০ থেকে কমে এখন ৫৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইছে। খোয়াই নদীর বাল্লা স্টেশনে পানি বিপৎসীমার ১৯৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইছিল, গতকাল বিপৎসীমার ৪৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইছে, তবে একই নদীর হবিগঞ্জ স্টেশনে পানি শুক্রবারে ১৬৫ সেন্টিমিটার ওপরে ছিল, যা গতকাল বিপৎসীমার নিচে নেমে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
এদিকে, পূর্বাঞ্চলীয় কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও ফেনী জেলার ভারতীয় ত্রিপুরা সীমান্তবর্তী অঞ্চলে এবং ত্রিপুরা প্রদেশের অভ্যন্তরীণ অববাহিকাসমূহে উল্লেখযোগ্য বৃষ্টিপাত হয়নি। ফলে উজানের নদ-নদীর পানি কমা অব্যাহত আছে।
এর ফলে বর্তমানে মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, ফেনী, কুমিল্লা ও চট্টগ্রাম জেলার নিম্নাঞ্চলের বিদ্যমান বন্যা পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতি শুরু হয়েছে এবং অব্যাহত আছে। এদিকে ফেনী, নোয়াখালীসহ উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জেলার এ আকস্মিক বন্যায় এ পর্যন্ত ১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। শনিবার দুপুর ১২টায় সচিবালয়ে মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আয়োজিত ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানান দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. কামরুল হাসান।
তিনি বলেন, শনিবার পর্যন্ত ১৮ জন মারা গেছেন। এর মধ্যে কুমিল্লায় চারজন, ফেনীতে একজন, নোয়াখালীতে তিনজন, চট্টগ্রামে পাঁচজন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একজন, লক্ষ্মীপুরে একজন ও কক্সবাজারে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে।
সচিব বলেন, এখন পর্যন্ত দেশের ১১টি জেলায় ৯ লাখ ৪৪ হাজার ৫৪৮টি পরিবারের ৪৯ লাখ ৩৮ হাজার ১৫৯ জন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
তিনি বলেন, দুর্গত এলাকাগুলোতে আমাদের তিন হাজার ৫২৭টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে দুই লাখ ৮৪ হাজার ৮৮৮ জন মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। আর ২১ হাজার ৬৯৫টি গবাদিপশু আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে এসেছি।
‘বন্যাকবলিত ১১টি জেলায় তিন কোটি ৫২ লাখ নগদ টাকা, ২০ হাজার ১৫০ মেট্রিকটন চাল, ১৫ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার, শিশুখাদ্য বাবদ ৩৫ লাখ টাকা ও গোখাদ্য বাবদ ৩৫ লাখ টাকা পাঠিয়ে দিয়েছি’- বললেন সচিব।
বন্যা কবলিত আরইবির ১১টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি এবং পিডিবির ৫টি বিদ্যুৎ অফিস ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই দুই বিতরণ কোম্পানির মোট ১৮টি উপকেন্দ্র বন্ধ আছে, যা শুক্রবার (২৩ আগস্ট) ছিল ২২টি। শনিবারের (২৪ আগস্ট) হিসাবে বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় আছে আরইবির প্রায় ৯ লাখ ২৪ হাজার ২৬৬ জন গ্রাহক, যা শুক্রবার ছিল প্রায় ১১ লাখ। এদিকে পিডিবির অধীনে প্রায় ৯৭ হাজার গ্রাহক বিদ্যুৎহীন ছিল, শনিবার তা ৪৩ হাজারে নেমে এসেছে। বর্তমানে সব মিলিয়ে ৯ লাখ ৬৭ হাজার ২৬৬ গ্রাহক এখনও বিদ্যুৎহীন অবস্থায় রয়েছেন। শুক্রবার প্রায় ১২ লাখ গ্রাহক বিদ্যুৎহীন ছিলেন।
লক্ষ্মীপুরে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। হু হু করে বাড়ছে পানি। আশ্রয়কেন্দ্রে মানুষ ছুটছে বলে খবর পাওয়া গেছে। শুক্রবার (২৩ আগস্ট) থেকে বৃষ্টি না হলেও বাড়ছে পানি। পার্শ্ববর্তী নোয়াখালী জেলার বন্যার পানি রহমতখালী খাল হয়ে লক্ষ্মীপুরের লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে। এতে পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে ভয়াবহ বন্যার আশঙ্কা করছে স্থানীয় লোকজন।
লক্ষ্মীপুরে গত কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিতে জেলার প্রায় বেশির ভাগ এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। তবে গত দুই দিন ধরে বৃষ্টিপাত না হলেও পানির উচ্চতা বাড়তে থাকে। ফলে ভয়াবহ বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। জেলার সদর উপজেলার পৌর এলাকা, মান্দারী, চন্দ্রগঞ্জ, উত্তর জয়পুর, দত্তপাড়া, চরশাহী, কুশাখালী, তেওয়ারীগঞ্জ, ভবানীগঞ্জ, বাঙ্গাখা, পার্বতীনগর, টুমচর ইউনিয়ন এবং জেলার কমলনগরের চরকাদিরা ও রামগতির চর বাদাম, চর পোড়াগাছা ইউনিয়ন, রায়পুর এবং রামগঞ্জ উপজেলায় ভয়াবহ পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
অন্যদিকে নোয়াখালীতে বন্যার উন্নতি হয়েছে বলে জানা যায়। জেলার পানি উন্নয়ন বোর্ডর নির্বাহী প্রকৌশলী মুন্সি আমীর ফয়সল জানান, সেনবাগ ও কোম্পানিগঞ্জে ডাকাতিয়া ও ছোট ফেনী নদী থেকে পানির চাপের কারণে পরিস্থিতি স্থিতিশীল রয়েছে। এদিকে মুছাপুর ক্লোজার ভাটার সময় খোলা রাখায় অবস্থার উন্নতি হবে বলে আশা করা যাচ্ছে এবং গত দুই দিন বৃষ্টি না হওয়ায় এবং এ দুদিনই সূর্য উঠার কারণে জলাবদ্ধতা ও বন্যা পরিস্থিতি উন্নতিতে সহায়ক হয়েছে। আগামী কয়েকদিন বৃষ্টি না হলে পরিস্থিতির আরও উন্নতি হবে।









