ওসমান হাদি কে
স্টাফ রিপোর্টার// সাহিবুল ইসলাম
শরিফ ওসমান হাদি, যিনি সাধারণভাবে ওসমান হাদি নামে পরিচিত, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক আলোচিত নাম। জুলাই গণঅভ্যুত্থান–পরবর্তী সময়ে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র হিসেবে তিনি পরিচিতি পান। একই সঙ্গে তিনি আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
জুলাই শহিদদের অধিকার রক্ষা, আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধকরণ আন্দোলন এবং ভারতীয় আধিপত্যবাদবিরোধী সক্রিয় রাজনীতির কারণে তিনি জাতীয় পর্যায়ে আলোচনায় উঠে আসেন। তবে ২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর ঢাকার বিজয়নগরে গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনায় তার নাম নতুন করে দেশজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসে।

জন্ম ও শিক্ষাজীবন
ওসমান হাদির জন্ম ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলায় এক মুসলিম পরিবারে। তার বাবা ছিলেন একজন মাদ্রাসা শিক্ষক ও স্থানীয় ইমাম। ছয় ভাইবোনের মধ্যে তিনি সর্বকনিষ্ঠ।
তার শিক্ষাজীবন শুরু হয় নলছিটির একটি মাদ্রাসায়। তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত সেখানে পড়াশোনা শেষে তিনি ঝালকাঠি এন এস কামিল মাদ্রাসায় ভর্তি হন এবং আলিম পরীক্ষা সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন।
রাজনৈতিক সক্রিয়তা
পরবর্তীকালে ঢাকার রামপুরা এলাকায় বসবাস শুরু করেন হাদি। জুলাই আন্দোলনের সময় তিনি স্থানীয় সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন এবং রামপুরা এলাকার সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনে তাকে অন্যতম তরুণ নেতৃত্ব হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ২০২৫ সালের আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধকরণ আন্দোলনে তাকে প্রধান নেতৃত্বের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ওই আন্দোলনে ইনকিলাব মঞ্চ “ন্যাশনাল অ্যান্টি-ফ্যাসিস্ট ইউনিটি” ব্যানারের অধীন সক্রিয় ভূমিকা পালন করে।

ইনকিলাব মঞ্চ
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী ছাত্র-জনতার অভিজ্ঞতা ও দাবির ভিত্তিতে গড়ে ওঠে ইনকিলাব মঞ্চ। শরিফ ওসমান হাদির উদ্যোগেই সংগঠনটির যাত্রা শুরু হয়।
সংগঠনটির ঘোষিত লক্ষ্য হলো—সব ধরনের আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং ন্যায়বিচার ও গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণভিত্তিক একটি “ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা” প্রতিষ্ঠা।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নিয়ে অবস্থান
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাঠামোগত দুর্বলতা ও দৃশ্যমান পরিবর্তনের ঘাটতির সমালোচনা করে তিনি সব দলের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি জাতীয় সরকার গঠনের প্রস্তাব দেন।
ঢাকা-৮ আসন থেকে প্রার্থিতা
২০২৫ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দেন ওসমান হাদি। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এলাকার জনগণের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময় ও “চা-সিঙ্গারা আড্ডা” আয়োজনের ঘোষণা দিলে তা গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায় নিয়ে প্রতিক্রিয়া
২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালের বিরুদ্ধে দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের রায়ের পর হাদি বলেন, এই রায় বিশ্বের জন্য একটি নজির, যা প্রমাণ করে কোনো স্বৈরাচার চিরদিন জনগণের ওপর নিপীড়ন চালাতে পারে না।

গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা
২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর, জুমার নামাজের পর রাজধানীর পল্টনের বিজয়নগর কালভার্ট এলাকায় তিনটি মোটরসাইকেলে আসা অজ্ঞাত দুর্বৃত্তরা ওসমান হাদির চোয়ালে গুলি করে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়।
চিকিৎসকদের মতে, সে সময় তিনি গভীর কোমায় ছিলেন; তার জিসিএস স্কোর ছিল ৩। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ১৫ ডিসেম্বর তাকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়।
এর আগেই তিনি আওয়ামী লীগের সমর্থকদের কাছ থেকে হত্যার হুমকি পাওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। হামলাকারী হিসেবে কয়েকজনকে শনাক্ত করা হয়েছে বলে জানানো হয়, যাদের কেউ কেউ সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে পালিয়েছেন বলে অভিযোগ ওঠে। ঘটনায় একাধিক সহযোগীকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।

হুমকি ও বিতর্ক
হাদি জানান, তিনি আগেও ফোনকল ও বার্তার মাধ্যমে মৃত্যু-হুমকি পেয়েছেন—যার মধ্যে বাড়িতে আগুন দেওয়া ও পরিবারের সদস্যদের ক্ষতির হুমকিও ছিল। তবে এসব হুমকি তাকে আন্দোলন থেকে সরাতে পারেনি বলে তিনি দাবি করেন।
২০২৫ সালে গোপালগঞ্জে একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি ঘিরে দেওয়া তার কড়া ও গালিগালাজপূর্ণ বক্তব্য নিয়েও বিতর্ক সৃষ্টি হয়। পরে তিনি এ বিষয়ে দুঃখ প্রকাশ করেন।
ব্যক্তিগত জীবন
ব্যক্তিগত জীবনে শরিফ ওসমান হাদি বিবাহিত এবং এক সন্তানের জনক।












